কথাসাহিত্যিক তানজিম তানিমের প্রকাশিত লেখা সমূহ, যেখানে গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা এবং বিভিন্ন রচনা একত্রে পাঠকের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে।
কিছু মানুষ ভালাে থাকার আশায় এই শহরকে ভালােবেসে তার বুকে বসতি গড়ে। কিন্তু শহর তাদেরকে ভালােবাসতে পারে না। দিনশেষে অনেকেই ভালাে নেই। অনেক অজানা সমীকরণে বাধা। তবু কেউ জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, “ভালাে আছি।” মনের গহিনে কষ্ট রেখে ভালাে আছি বলতে বলতে কিছু মানুষ খুব ক্লান্ত। এই ক্লান্তি বুকে নিয়েই দুঃখ-আনন্দের মেঘ দিয়ে তারা কল্পনার মেঘকুটির তৈরি করে। একসময় তারা সত্যি সত্যি মেঘ হয়ে যায়, দূরের মেঘ। জীবনের শেষে অথবা সম্পর্কের শেষে শুধু স্মৃতি থাকে, সময়টা হারিয়ে যায়।
সংসার এক মায়া। মানুষ এই মায়ায় জড়িয়ে যায় জীবনের শুরু থেকেই। জীবনে চলতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি দরকার হয় পাশে একজন ভালো মানুষ। অর্থ ধার করে চলা যায়, ভালো মানুষ ধার করে চলা যায় না। মানুষ ভালো মানুষের আশায় ভালোবাসে।
ভালোবাসা দামি, সবাই তা পায় না। কেউ ভুল মানুষকে ভালোবেসে জীবন কাটিয়ে দেয়। কেউ সঠিক মানুষকে ভুল সময়ে ভালোবাসে। আমাদের ভালোবাসার সুখ—দুঃখের আবেগগুলো জীবনকে নাড়া দিতে চায়।
কিন্তু জীবন অসীম গভীরতার মহাসমুদ্রের মতোই গভীর। এসব টুকরো আবেগ জীবন মহাসমুদ্রে হারিয়ে যায় অনায়াসেই। সেগুলো সেখানে নিজের মতো পড়ে থাকে, দুঃখবিলাসে মেতে উঠে কিন্তু বাইরের আলোতে উঠে আসার সময় সলজ্জে কেটে পড়ে।
তারা জীবনের মূল স্রোতটিকে খুব বেশি নাড়াতে পারে না। জীবন জীবনের নিয়মে চলে। সেই নিয়ম কেউ জানে না।
আনিসুর রহমান আগ্রহ নিয়ে আমার উত্তরের অপেক্ষায় আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
“আমি জানি না।“
“তক্ষক যে আছে এটা সিওর তো? না মানে এরা কিন্তু নিশাচর।
রাতে আলামত পান?” “জি।”
“এরা টককো টককো বলে ডাকে।” আনিসুর রহমান তক্ষকের ডাক নকল করে দেখান।
“জি। আমি সিওর।”
আনিসুর রহমান আগ বাড়িয়ে আমাকে জ্ঞান দিতে থাকেন, আমি আনিসুর রহমানকে বলি, “আপনি আজ আসুন।” আনিসুর রহমান চলে যান। আমার মেজাজ কিছুটা খারাপ। আমি, ঝিতু আর মিম। আমাদের জীবনের গল্প। খুব সাধারণ তিনজন মানুষের সাধারণ গল্প। কিন্তু এসব গল্প তো এতটা স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল না!
আবেগ এবং উদ্বেগের মধ্যে কে বিজয়ী হবে? আবেগ না উদ্বেগ?
প্রিয় পাঠক, একজন লেখকের গল্প একটি ‘রোমান্টিক সাসপেন্স’ উপন্যাস।
জীবন বোধহয় এক বয়ে চলা নদী। কবিতা তার স্রোত। স্রোত ছাড়া যেমন নদীকে সুন্দর লাগে না তেমনি ছন্দ ছাড়াও জীবনকে নিরর্থক লাগে। তাই আমরা সবসময় পদ্যের ছন্দে জীবনকে সাজাতে চাই। কিন্তু জীবন সাজে না। সাজতে তার চরম অনীহা। খরস্রোতা নদীর মতো জীবনও টালমাটাল হয়ে পড়ে। ছন্দ ভেঙ্গে তৈরি করে এক কাঠখোট্টা গদ্য। জীবনগদ্য মূলত আমাদের সকলের জীবনের ছন্দহীন পদ্য।
কথাসাহিত্যিক তানজিম তানিম’র কবিতার বই জীবনগদ্য। যদিও কবিতা তার লেখার বিষয়বস্তু না তবু তার কবিতার হাত ভালো। তার জীবনবোধ স্পষ্ট, তিনি জানেন তিনি কী বলছেন।
রমিজউদ্দিনকে ধরে আনা হয়েছে। ধরে এনেছেন খোদ ক্যাপ্টেন ইমরান। তিনি পাক আর্মির বাঙ্কারে হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে আছেন। জয়নবুন্নেছা নৌকা নিয়ে রওনা হয়েছেন। পথিমধ্যে দুই খালের পানির ঘূর্ণিতে নৌকা আটকে আছে। রমিজউদ্দিনের চোখের কোণেও হালকা পানি। কাল সকালে তাকে ফায়ার করা হবে। হয়তো কঠিন আযাবের মত্যু শেষে তার দেহ থুথুর জন্য জনসম্মুখে রাখা হবে। হয়তো তার কবরে লেখা রইবে,
ইধার শো রাহা হ্যাঁ এক গাদ্দার!
হোক। তার ধর্ম ন্যায়ের ধর্ম। এটাই তার ধর্মের নীতি। মজলুমকে সাহায্য করা, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, এই হিম্মতগুলো লাগে। নাহলে পরকালে মহান রব আল্লাহর কাছে আমরা কী জবাব দেবো? ইসলাম শান্তির ধর্ম, যুদ্ধের ধর্ম নয়। যারা যুদ্ধের খাতিরে, জমির খাতিরে ইসলামকে ব্যবহার করে চলে তারা কখনো খাঁটি মুসলমান নয়। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে মজলুমের জয় একদিন নিশ্চিত ইনশাআল্লাহ। রমিজউদ্দিনের চোখের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। সেখানে তিনি খুকু এবং কবিরকে দেখছেন। আর গাইছেন,
বিজয় নিশান উড়ছে ঐ
উড়ছে ঐ, উড়ছে ঐ।
তার কণ্ঠ ম্রিয় থেকে ম্রিয়মাণ হয়।
একটি নিঃশব্দ রাত।
আশফাক সাহেব আত্মহত্যার সমস্ত প্রস্তুতি সেরে ফেলেছেন। কালিয়াকৈর বাজার থেকে আনা এক কৌটা বিষ, জল্লাদের গিঁট দেওয়া দড়ি, এক পাতা ক্লোনাজেপাম—সবই বিকল্প হিসেবে পাশে রাখা। পাশের ঘরে ছেলে আদনান ঘুমাচ্ছে নির্ভার, আর তিনি নিজে নিঃশব্দে এগোচ্ছেন এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। ওয়ালেটে গুঁজে রেখেছেন শেষ বার্তা:
“আমি আর এ দুঃস্বপ্নের ভার বইতে পারছি না।”
কিন্তু ঠিক তখনই ঘটে অপ্রত্যাশিত কিছু।
রাত গভীর হলে দেখা যায়—আদনান ছুরি হাতে বসে আছে তার ঘরের সোফায়। দৃশ্যটা যেন কোনো পুরনো দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়েন। ফের জেগে ওঠেন, এবং এবার—ঘটনাটি সত্যি!
এই উপন্যাস শুধুমাত্র এক ব্যক্তির আত্মহননের গল্প নয়—এ এক শ্বাসরুদ্ধকর মানসিক ভ্রমণ, দুঃস্বপ্ন, দায়বদ্ধতা ও পারিবারিক মানসিক ভারসাম্যের এক নির্মম খতিয়ান।
No posts found.
তানজিম তানিম একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক। তিনি একাধারে একজন সাহিত্যিক, ব্যাংকার ও গবেষক। পাঠকদের ভালোবাসায় সমৃদ্ধ এই লেখক মনে করেন-
“মাদক নয়, মানুষ যেন বইয়ে আসক্ত হয়।”
© Designed & Developed by Thinkspire Studio